প্রাচীন স্থাপত্যাবিদ্যা ও বিশ্বকর্মার ইতিহাস

571

স্থাপত্যবিদ্যা ও বিশ্বকর্মা

ঋকবেদের দশম মণ্ডলে যে দুটো সুক্ত আছে , তার দেবতা বিশ্বকর্মা এবং এর ঋষিও বিশ্বকর্মা। ঋকবেদের প্রথম পর্বে বহুদেববাদের চর্চা ছিল। বহুদেবতার পূজক বা গোষ্ঠী ছিল আলাদা আলাদা। সম্ভবত বিভিন্ন পূজক গোষ্ঠীর মধ্যে মতানৈক্য ও বিবাদের কারণে সেই সময়ের সুধীজনেরা একটা সম্মিলনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিলেন। তখন এই বিশ্বকর্মা ও প্রজাপতি দেবতার কল্পনা করা হয়। বিশেষত সেই সময়ে বিশ্বকর্মা বলতে বেদে উক্ত সকল দেবতার এক সম্মিলিত রূপ হিসেবে দেখা হত। এর পরের পর্বে ব্রহ্ম নামক সর্বাতিশায়ী একটি অদ্বয় ঈশ্বরের কল্পনা করা হয়। উপনিষদে এই ব্রহ্ম-ধারণা নিজস্ব রূপ লাভ করে। সকল উপনিষদের সারভাগ যে গীতা, সেখানে ব্রহ্ম-ধারণা অন্য এক বলিষ্ঠ রূপ দেখা যায়। বলা হয় –

 ‘যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে ত্বাং স্তথৈব ভজাম্যহম’ – ইত্যাদি।

বহুদেবববাদী আর্যরা ব্রহ্ম-কল্পনার আদিতে বিশ্বকর্মার কল্পনা করেছিল। এই বিশ্বকর্মা এই বিশ্বের সবকিছু নির্মাণ করেছিলেন। তিনি নির্মাণ-দেবতা বা স্থাপত্য দেবতা। পৃথিবীর মধ্যে জলাশয়ের সংক্ষিপ্তায়নের প্রথম পর্বে যখন সমতল গঠিত হচ্ছিল সেই সময় এই বিশ্বকর্মাই সমতলের গৃহ সহ অন্যান্য সকলের আকার নির্মাণ করেছিলেন।

ঋক বেদের দশম মণ্ডলের ৮১ ও ৮২ নং সুক্তে ১৪টি শ্লোক আছে বিশ্বকর্মা দেবতাকে উদ্দেশ্য করে। উপরোক্ত দুটি সুক্তের ঋষিও (রচয়িতা) বিশ্বকর্মা। সেখানে এই আদি বিশ্বকর্মা সম্বন্ধে বলা হয়েছে —

কিং স্বিদাসীদধিষ্ঠানমারম্ভণং কতমৎস্বিৎ কথাসীৎ।

যতো ভূমিং জনরন্বিশ্বকর্মা বি দ্যামৌর্ণোন্মহিনা বিশ্বচক্ষাঃ।।  (৮১/২)

বঙ্গানুবাদ — সৃষ্টিকালে তাঁর অধিষ্ঠান অর্থাৎ আশ্রয়স্থলে কী ছিল ? কোন স্থান হতে কীরূপে তিনি সৃষ্টি কার্য আরম্ভ করলেন ? সে বিশ্বকর্মা, বিশ্বদর্শনকারী দেব কোন স্থান থেকে পৃথিবী নির্মাণপূর্বক প্রকাণ্ড আকাশকে উপরে বিস্তারিত করে দিলেন !

বিশ্বকর্মা বিমনা আদ্বিহায়া ধাতা বিধাতা পরমোত সন্দৃক্‌।

তেষা মিষ্টানি সমিষা মদন্তি যত্রা সপ্তঋষীন্‌ পর একমাহুঃ।।

বঙ্গানুবাদ — যিনি বিশ্বকর্মা, তাঁর মন বৃহৎ, তিনি নিজে বৃহৎ, তিনি নিজে নির্মাণ করেন, ধারণ করেন, তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সকল অবলোকন করেন, সপ্ত ঋষির পরবর্তী যে স্থান সেখানে তিনি একাকী আছেন, বিদ্বানগণ এরূপ বলেন। সে বিদ্বানদের অভিলাষ সকল অন্ন দ্বারা পরিপূর্ণ হয়।

শিল্পীর কল্পনায় স্বর্ণলঙ্কা
শিল্পীর কল্পনায় সমুদ্রগর্ভে হারিয়ে যাওয়া দ্বারকা নগর

পুরাণে আমরা যে বিশ্বকর্মাকে পাই তার তার বাবা অষ্টম বসু প্রভাস ( ইনিই অভিশপ্ত হয়ে মর্ত্যে ভীষ্ম হিসেবে বিখ্যাত হয়েছিলেন) , মাতা স্ত্রী বৃহস্পতির বোন যোগসিদ্ধা বা যোগসত্তা। তিনি অঙ্গীরা তনয়া। বোঝা যাচ্ছে ইনি অঙ্গীরা গোত্রীয়। অঙ্গীরা গোত্রীয়রা ভারতে প্রথম অগ্নি পূজার প্রচলন করেছিল। বিভিন্ন ক্ষেত্রে আগুনের ব্যবহার তারা চালু করেছিল। বিশ্বকর্মাও তার মাতার সূত্রে তার নির্মাণকর্মে আগুনের ব্যবহার শুরু করেছিল বলেই মনে করা উচিত। বিশ্বকর্মার ছেলে নল লঙ্কাপুরী ও নির্মাণ করেছিল।

বিশ্ব (বিশ্‌+ব) শব্দটি কয়েক হাজার বছরের ব্যবহারে অর্থের বিচিত্র পরিবর্তন হয়েছে। বেদ, এমনকি পুরাণের যুগেও ‘বিশ’ — এর অর্থ ছিল বিভিন্ন নৃতত্ত্বের, বিভিন্ন পেশার মিশ্র (heterogynous) জনগোষ্ঠী।  বিষ্ণু শব্দটিও বিশ্‌ (+ক্‌নু) — ধাতুজাত।  সেই রকম ‘গণ’ কথাটির অর্থ ছিল একই নৃতত্ত্বের বা একই পেশার জনগোষ্ঠী (homonymous)। অনেকগুলি ‘গণ’ নিয়ে একেকটি ‘বিশ’ গঠিত হত। এই ‘বিশে’র অধিপতি ছিল বিশ্বপতি এবং গণের অধিপতি ছিল গণপতি। এই ‘বিশে’র দেবতা ছিল বিষ্ণু। ‘বিশে’র বৃত্তিকে বলা হত বৈশ্যবৃত্তি। এই ‘বিশ’ শব্দ থেকেই মূলে বিশ্বকর্মা শব্দটি নিষ্পন্ন হয়েছে।

‘বিশ’দের বসতি এলাকাকে বিশ্ব (এখনকার অর্থ world) বলা হত। তাদের কর্মকে বিশ্বকর্ম বলা হত। তাদের কর্মের আদি কর্মনেতা ছিল ঋষি বিশ্বকর্মা। পরবর্তীকালের যে কোনো এলাকার অতীব দক্ষ নির্মাণশিল্পীকে বিশ্বকর্মা বলা হত। পরে এই নামটি পদের (designation) নামে পরিণত হয়েছিল। তাই আমরা বিভিন্ন পর্বে একাধিক বিশ্বকর্মা পাই।

কবিকঙ্কন মুকুন্দের চণ্ডীমঙ্গলে পাই ইনি দেবীর আদেশে দেউল ও নগরী নির্মাণ করেছিলেন। আবার কাঁচুলীর অলঙ্করণ করেছিলেন। নৌকা গড়ে দিয়েছিলেন। ধর্মমঙ্গলে দেখতে পাই ইনি ধর্মের থান নির্মাণ করেছিলেন। আবার চাষীর কাস্তে, হল, ফাল গড়ে দিয়েছিলেন। ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গলে দেখা যায় ইনি হামান-দিস্তা তৈরি করে দিয়েছেন। আবার মুকুট, থালাগেলাস, কাঁচুলি-শাড়ি , ওড়নার অলঙ্করণ করে দিয়েছেন। ইনিই অন্নপূর্ণার মন্দির নির্মাণ করেছেন। আবার মনসামঙ্গলে লক্ষ্মীন্দরের বাসর ঘর নির্মাণ করেছেন। বোঝা যাচ্ছে মধ্যযুগে যারা দক্ষ নির্মাণ শিল্পী বা প্রাজ্ঞ স্থপতি ছিল তারাই বিশ্বকর্মা নামে অভিহিত হয়েছে।

আদিতে দেবতা বিশ্বকর্মা জগত নির্মাণ করেছিল বলে কল্পনা করা হয়েছে। পরবর্তীকালে ইনি স্থপতি-দেবতায় রূপান্তরিত হন। স্থাপত্যবিদ্যা নামক একটি উপবেদ রচিত হয় প্রাচীনকালেই। এই দেবতা সেই বেদের দেবতা হিসেবে পরিগণিত হন। এই পর্বেই তাঁর বাহন হিসেবে হাতিকে দেখা যায়। যে কোনো দুর্গম জায়গায় যেতে এবং ভারী নির্মাণ-যন্ত্র ব্যবহারে সক্ষম বলেই এই হাতিকে এই দেবতার বাহন হিসেবে নির্বাচন করা হয়। আর হাতি সুপ্রাচীন কাল থেকে ভারতবর্ষে মানব-সভ্যতার কাছাকাছি অবস্থান করেছে।

নাক্ষত্রিক গণনার কিছু আভাস পাওয়া যায় যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধির বই (পূজা পার্বণ, যোগেশ চন্দ্র রায়, বিশ্বভারতী, ১৩৫৮ বঙ্গাব্দ ) থেকে। তাঁর মতে আকাশের গ্রহ-নক্ষত্র আপাতভাবে স্থির হলেও উত্তরায়ণ (২২ ডিসেম্বর), দক্ষিণায়ন ( ২১ জুন), মহাবিষুব ( ২১  মার্চ) ও জলবিষুব ( (২২ সেপ্টেম্বর ) প্রতি হাজার বছরে ১২ দিন করে পিছিয়ে যায়। এর পাশাপাশি আমাদের ষড়ঋতুও হাজার বছরে ১২ দিন করে পিছিয়ে যায়। সেই হিসেবে এখন আমরা আষাঢ়-শ্রাবণ বর্ষাকাল ধরি। আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগে আজকের তুলনায় আরও ৩০ দিন সামনে বর্ষাকাল ছিল। অর্থাৎ শ্রাবণ-ভাদ্র বর্ষাকাল ছিল। সেই সময় অয়ন-দিন ধরে বর্ষ বা মাস গণনা হত। পূর্ণিমা তিথি ছিল মাসের শেষ দিন। ৩১৯ খ্রিষ্টাব্দ থেকে বৈশাখ মাসকে বছরের প্রথম মাস ধরা শুরু হয়। বুদ্ধের জন্মের সমসাময়িককালে ভাদ্র-পূর্ণিমার চারদিন আগে দ্বাদশীতে ইন্দ্রের ধ্বজা পোঁতা হত। একে বামন দ্বাদশী বলা হয়।  এই ভাদ্র-পূর্ণিমাতেই (চান্দ্র মাস অনুসারে সংক্রান্তি) বিশ্বকর্মার পুজো হত। এই মাসে চন্দ্র উত্তরভাদ্রপদ নক্ষত্রে অবস্থান করলে পূর্ণিমা হয়। দুটি ভাদ্রপদ নক্ষত্রকে একত্রে (আকাশে) একটি হাতি কল্পনা করেছিলেন প্রাচীন ঋষিরা। এই পূর্ণিমায় বিশ্বকর্মা (বা লক্ষ্মী  — গজলক্ষ্মী) পুজো হয় বলেই হাতি তার বাহন। ইন্দ্রের ধ্বজা পোতার পরে সেই সময়ে এইদিন সকল যুদ্ধাস্ত্র প্রস্তুত করা হত। সে জন্যে ইন্দ্রের বাহন ঐরাবত বা হাতি।  তিন ধরনের হাতি প্রাচীন শাস্ত্রে পাওয়া যায় – মৃগ মন্দ্র ও ভদ্র। গণেশের মাথায় যে হাতি থাকে সেটা মৃগ (পিঙ্গল)। বিশ্বকর্মার হাতি ভদ্র (কালো)। যুদ্ধের আগে বা স্থাপত্যকর্ম বা যেকোনো ধরনের শ্রমকেন্দ্রিক কর্মের যন্ত্র সজ্জিত করা হত এই দিন। এখনও এই প্রস্তুতি বা পুজো প্রচলিত আছে বাংলার ঘরে ঘরে।

মোদেরার সূর্য মন্দিরে বিশ্বকর্মা

ইন্দ্রের ধ্বজা পোতার সঙ্গে প্রাচীনকালে স্থাপত্যবিদ্যার যে ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিল সেটা ভরতের নাট্যশাস্ত্রে দেখা যায় –

    এতত্তু বচনং শ্রুত্বা প্রত্যুবাচ পিতামহ।

    মহানয়ং প্রয়োগস্য সময়ঃ সম্পুস্থিতঃ।।

   অয়ং ধ্বজমহঃ শ্রীমান্‌ মহেন্দ্রস্য প্রবর্ত্ততে ।।

   অত্রেদানীময়ং বেদো নাট্যসঙ্গঃ প্রযুজ্যতাম্‌।।  (১/৫৩—৫৫)

বঙ্গানুবাদ — এই কথা শুনে ব্রহ্মা উত্তরে বললেন – নাট্যানুষ্ঠানের অতীব উপযোগী সময় উপস্থিত হয়েছে। এই ইন্দ্রধ্বজ উৎসব শুরু হয়েছে। এখন এই উপলক্ষ্যে নাট্যবেদ প্রয়োগ করুন।

এই ইন্দ্রধ্বজ উৎসব হত বামন দ্বাদশী তিথিতে। যাকে এখন লোকে ইন্দ্রদ্বাদশী বলে। এই দিনেই ইন্দ্র দৈত্যদেরকে বধ করেছিল। এই ইন্দ্রধ্বজ উৎসবের পরে অর্থাৎ বর্ষার শেষে রঙ্গালয় প্রতিষ্ঠা বা সংস্কার করা হত। রঙ্গালয় কেমন হবে তার বিস্তৃত বিবরণ ভরত তাঁর নাট্যশাস্ত্রে ( ১/৩) দিয়েছেন। এই দিন থেকে সাধারণ নাগরিক একদিকে গৃহ, দেবগৃহ, দেবস্থান, কূপ, জলাশয় নির্মাণ শুরু করত। অন্য দিকে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ বা ‘বিশে’র জনগণ তাদের কাজের যাবতীয় যন্ত্র (কৃষকের হল বা অন্যান্য, কর্মারের লৌহ যন্ত্র, কুমোরের শাল, তাঁতীর যন্ত্রপাতি, স্থপতির যাবতীয় যন্ত্র প্রভৃতি) সংস্কার করত। যন্ত্রপাতি নতুনভাবে নির্মাণ করা শুরু করত। ফলে এই তিথিটিতে পরে যন্ত্রদেবতার পুজো হিসেবে প্রচলিত হয়ে গিয়েছিল। একদিকে ইন্দ্রদেবতার পুজোর গরিমা লুপ্ত হতে থাকলো, পাশাপাশি সেই দিনটি বিশ্বকর্মার পুজো হিসেবে খ্যাতি লাভ করতে লাগলো। ৩১৯ খ্রিষ্টাব্দ থেকে যখন আধুনিক পঞ্জিকা শুরু হলো তখন সৌরমাস ও চান্দ্রমাস আলাদা হয়ে গেল। চান্দ্রমাসের সংক্রান্তি ছিল ভাদ্রপূর্ণিমা। আগে সেইদিন বিশ্বকর্মা পুজো চালু ছিল। কিন্তু সৌরমাসের সংক্রান্তির দিন বিশ্বকর্মার পুজো পরিবর্তিত হয়ে গেল এরপর থেকে। দু হাজার বছরে ঋতু এগিয়ে গেল প্রায় ২৪ দিন। ফলে এখন বর্ষাকাল শেষ হয় শ্রাবণ মাসে। কিন্তু প্রাচীন রীতি চলিত থাকলো। এখনও সৌর ভাদ্রমাসের সংক্রান্তির দিনে বিশ্বকর্মা পুজো হচ্ছে। অন্যদিকে বামন দ্বাদশী ও লক্ষ্মীপুজো কিন্তু চান্দ্রমাস অনুসারে হয় এখনও।

কেননা বিশ্বকর্মা মূলত শ্রমজীবী মানুষের দেবতা। ফলে সৌরমাস গণনা তাদের পক্ষে সুবিধা। অন্যদিকে ইন্দ্র ও লক্ষ্মী মূলত ব্রাহ্মণ–ক্ষত্রিদের দেবতা। তাই প্রাচীন চান্দ্রমাস অনুযায়ী এখনও ইন্দ্র ও লক্ষ্মী পূজিত হতে থাকে।

বিশ্বকর্মা গুহা (ইলোরার ১০ নং গুহা)

ঋকবেদের যুগে যেমন কাঁচামাটি দিয়ে এসব নির্মাণ যেমন ছিল, তেমনই পোড়ামাটি দিয়ে, পাথরকে নির্দিষ্ট মাপে ভেঙে নিয়ে মঠ, বেদী, বাড়ি প্রভৃতি নির্মাণ ছিল। ‘বিশ’-এর জনগণ এসব করত। বিশ্বকর্মা বা এই অভিধাধারী ব্যক্তিরা সেসবের দেখাশোনা করত। এর জন্যে প্রামাণ্য পুস্তিকা ছিল। সেগুলিকে উপবেদ বলা হত। চার রকমের উপবেদ ছিল – আয়ুর্বেদ, ধনুর্বেদ, গান্ধর্ববেদ (সঙ্গীত) ও স্থাপত্যবেদ। আমরা একাধিক শুল্বসূত্রের সন্ধান পাই – বৌধায়ন, আপস্তম্ব, মৈত্রায়ণী, বারাহের শুল্বসূত্র । এই শুল্বসূত্রের পরবর্তী প্রকরণ ছিল চতুর্থ উপবেদ স্থাপত্যবেদ। প্রথম পর্বে এই স্থাপত্যবেদের মূল দেবতা ছিল ইন্দ্র। তখনও বিশ্বকর্মা আলাদা স্থাপত্যদেবতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এর পরবর্তী পর্বে যেহেতু ইন্দ্র মূলবেদের দেবতা তাই বিশ্বকর্মা আলাদা দেবতা হিসেবে গুরুত্ব পেতে শুরু করে। এই স্থাপত্যবেদের কিয়দংশ (শুধুমাত্র রঙ্গালয়) ভরত তাঁর নাট্যশাস্ত্রে বলেছেন।

যজ্ঞবেদী বা তার আচ্ছাদন নির্মাণ, প্রাসাদ বা বাড়ি নির্মাণ, কুপ বা জলাশয়ের সিড়ি নির্মাণ আমরা হরপ্পা সভ্যতায় দেখেছি। হরপ্পা সভ্যতার স্থাপত্য আমরা ভগ্নাবস্থায় কিছুটা দেখতে পাই। সেখানে পোড়া মাটির তৈরি ইটের ব্যবহার ও উন্নত স্থাপত্য দেখে বা কিছুটা অনুমান করে বুঝতে পারি। হরপ্পা সভ্যতায় এখনো পর্যন্ত আবিষ্কৃত ৭১ টি কেন্দ্রে গ্রামীণ সভ্যতা যেমন পাওয়া গিয়েছে। তেমনি উন্নত নগরের পরিচয় পাওয়া গিয়েছে। যে নগরের বাড়ি-ঘর সবই উন্নত পরিকল্পনা ও নির্মাণ শিল্পের পরিচয় বহন করে।

#হরপ্পা সভ্যতার নগর পরিকল্পনা

অন্যদিকে আর্যসভ্যতার স্থাপত্যবেদের আদিরূপ পাওয়া যায় বেদাঙ্গের কল্পসূত্রতে। কল্পসূত্রের অন্যতম প্রধান সূত্র ছিল শুল্বসূত্র। শুল্ব কথার অর্থ দড়ি ( এখনও এই শব্দটি চালু আছে পরিবর্তিত রূপে। গ্রামের লোকেরা দড়িকে শলা বলে – একথা আমি নিজে শুনেছি রাঢ় বাংলায়) । আঙুল – হাত – দণ্ড – দড়ি, মাপের একক এখনও চালু আছে প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকায়। এই শুল্বসূত্র সম্পূর্ণভাবে নির্মাণকাজের মাপজোক-কেন্দ্রিক বিষয়। এই সূত্র ঋকবেদের সমসাময়িককালেই রচিত হয়েছিল ; কেননা যজ্ঞবেদী, আচ্ছাদন, প্রেক্ষাস্থান সেই সময়েই নির্মিত হয়েছে। পাশাপাশি বসতবাড়ি নির্মিত হয়েছে প্রথম দিকে কাঁচামাটি, কাঠ, খড় প্রভৃতি দিয়ে। পরবর্তীকালে পোড়ামাটি বা ইট ও পাথরে গৃহ নির্মিত হয়েছে। সেই ক্ষেত্রে স্তম্ভ , আচ্ছাদন নির্মাণের জন্যে কাঠ ব্যবহৃত হয়েছে। ঋকবেদের সময়ে পোড়া মাটির স্তম্ভ, অয়স ( কৃষ্ণায়স – লোহা, তাম্রায়স –তামা) নির্মিত স্তম্ভবিশিষ্ট বাড়ি ছিল একথা ঋকবেদের একাধিক জায়গায় পাওয়া যায়।

ঋকবেদের প্রথম মণ্ডলের ১৯১ – ১৯২ সুক্তে বিভিন্ন রকম বাড়ির উল্লেখ আছে। সপ্তম মণ্ডলে একাধিকবার হর্ম্য বা প্রাসাদের উল্লেখ আছে। পঞ্চম মণ্ডলের একাধিক সুক্তে স্তম্ভবিশিষ্ট প্রাসাদের উল্লেখ আছে। ধনী গৃহস্থের অট্টালিকার উল্লেখ আছে দশম মণ্ডলে। এখানে শম্বর, বৃত্রের প্রাসদের কথা আছে। ইন্দ্র দৈত্যদের নব-নবতি পুর বা নগরী ধ্বংস করেছিল। অর্থাৎ দেবতাদের যেমন নগরী, প্রাসাদ, অট্টালিকা ছিল তেমনি দৈত্যদেরও ছিল। সম্ভবত তাদের দেবতাও ছিল এই বিশ্বকর্মা।

অন্যদিকে আমরা মহাভারতের যুগে দনুর গর্ভজাত সন্তানদের উত্তরপুরুষ ময় দানবের কথা জানতে পারি। এই ময়ের পত্নী হেমা। পুত্র দুন্দুভি ও কন্যা মন্দোদরী। এই ময় , দানবদের নির্মাণশিল্পী ছিল। অর্জুন যখন খাণ্ডব বন দাহন করেছিল তখন ময় এই বনে বাস করত। তার সেখানে অসাধারণ সুন্দর অট্টালিকা ছিল। সে অর্জুনের শরণাপন্ন হলে তার প্রাণ রক্ষা পায়। সেই কৃতজ্ঞতা স্বরূপ সে পাণ্ডবদেরকে ইন্দ্রপ্রস্থে এক অসাধারণ প্রাসাদ নির্মাণ করে দেয়। এর থেকে বোঝা যায় আর্যদের মধ্যে যেমন নির্মাণশিল্প বা স্থাপত্যবিদ্যার গভীর চর্চা ছিল, তেমনই যারা আর্যত্ব গ্রহণ করে নি, যেমন — যক্ষ, রক্ষ, দৈত্য, দানব সকলেই স্থাপত্যবিদ্যার সঙ্গে অল্পবিস্তর পরিচিত ছিল। এদের সকলেরই দেবতা ছিল বিশ্বকর্মা। এরা সকলেই ছিল আর্য বা অগ্নি ও সূর্যপূজক।

#আজকের শিল্পীদের কল্পনায় পান্ডবদের ইন্দ্রপ্রস্থ

এই বিশ্বকর্মা একদিকে যেমন বাড়ি, ঘর, মন্দির দেবস্থান এর নির্মাণদেব। তেমনি তিনি ‘বিশ’– এর সকল যন্ত্রের দেবতা। আবার তিনি যুদ্ধাস্ত্রের দেবতা। অন্যদিকে চৌষট্টি কলার ( নৃত্য, গীত প্রভৃতি) দেবতা। এই বিভিন্নতার সমন্বয়েই বিশ্বকর্মার অবস্থান। ফলে ভাদ্র পোর্ণমাসী বা সংক্রান্তির পরে ক্ষেত্রের স্থাপনা হত। তার পর নববর্ষারম্ভে অর্থাৎ শারদীয়া নবমীর (তখন এই দিন থেকে বছর আরম্ভ হত) থেকে ক্ষেত্র পুজো হত। ক্ষেত্রের আকার –বৃত্ত, উপবৃত্ত, চতুর্ভুজ, ত্রিভুজ আয়তাকার বিভিন্ন রকম হত। গৃহের বিভিন্ন বিভাজন ও মাপ ছিল। এগুলিকে প্রকোষ্ঠ বলা হত। আর্থিক ক্ষমতা ও প্রয়োজনীয়তার ওপর নির্ভর করে এই প্রকোষ্ঠ বিবেচনা করা হত। এরপর এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশ অনুসারে গবাক্ষ, সম্মুখভাগ, অঙ্গন, ছত্র ঠিক করা হত। বৃষ্টিপাত, বায়ুর গতি, আলোর উজ্জ্বলতা, হিম বা শীতের প্রকোপতাকে খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়া হত।

খনার বচনে আছে –

(গৃহের) – ‘উত্তরে এড়ে দক্ষিণে ছেড়ে/ পুবে হাঁস আর পশ্চিমে বাঁশ’। অর্থাৎ উত্তরে আড়াল দিতে হবে, দক্ষিণে ছেড়ে রাখতে হবে, পূর্বদিকে জলাশয় এবং পশ্চিমদিকে বৃক্ষরাজি থাকা আবশ্যক। আলো ও বাতাসের গতি অনুযায়ী – ‘দখিন দুয়ারী ঘরের রাজা/ পুব দুয়ারী তাহার প্রজা/ পশ্চিম দুয়ারী মুখে ছাই/ উত্তর দুয়ারী কথাই না’।

এইসব লোকবচনের আড়ালে গৃহ নির্মাণের অভিজ্ঞতাগুলি বলা হয়েছে। এরপর বহিরঙ্গ সৌন্দর্য-নির্মাণ। প্রকৃতির ফুল, পাতা, পুরাণের গল্প প্রভৃতি অনুসারে বহিরঙ্গ সজ্জা রচনা করত স্থপতিরা। সামগ্রিকভাবে একটি মনুষ্য বা দেবগৃহ গঠিত হত। এই সৃষ্টি প্রক্রিয়ার আদ্যন্ত দেবতা হল বিশ্বকর্মা। এই প্রক্রিয়ার মধ্যে ‘বিশ’ এর অধিকাংশ বৃত্তিজীবীর কাজ গৃহীত হত। সামগ্রিক কাজকে বিশ্বকর্ম বলা হয়।

 লিখেছেন – তাপস বন্দ্যোপাধ্যায় (1) (2)

 

[do_widget id=blog_subscription-3]

Hits: 6820

Subscribe to our newsletter
Sign up here to get the latest news, updates and special offers delivered directly to your inbox.
You can unsubscribe at any time

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Leave A Reply

Your email address will not be published.

error: যোগাযোগ করুন - info.sthapatya@gmail.com