সমুদ্রগর্ভে হারানো সভ্যতা (A Tale of the Lost Underwater Cities )

416

এল ডোরাডো (El Dorado) , অ্যাটলান্টিস (Atlantis) , লেমুরিয়া (Lemuria) , শাম্বালা (Shambala), মু (Mu) … কিছু মনে পড়ছে ? ছোটবেলায় পড়া , অসংখ্য অ্যাডভেঞ্চার কাহিনীর পাতায় পাতায় জড়িয়ে থাকা রোমাঞ্চকর অভিযান ; দুর্ধর্ষ সব কাহিনীর গন্তব্যস্থল । আমার মত অনেকেই ; যারা পড়ার বইয়ের বাইরেও গল্পের বই পড়তে ভীষণ ভালোবাসতো তারা হয়তো বুঝে ফেলেছে ইতিমধ্যে।

হ্যাঁ, আমি বলছি হারিয়ে যাওয়া নগর আর সভ্যতার কথা; যাদেরকে ঘিরে পাতার পর পাতা অ্যাডভেঞ্চার কাহিনী লেখা হয়েছে ,কত মানুষ গোটা জীবনটাই ব্যয় করেছে তাদের খুঁজে বের করবে বলে। আমাজনের জঙ্গলে , গভীর সমুদ্রের তলদেশে ,পৃথিবীর কেন্দ্রে আবার কখনোও বা আফ্রিকার গহীন অরন্যে ছুটে গেছে তারা। কখনো ঘনাদা, কখনো জুল ভার্ন আবার কখনও হেমেন্দ্রকুমার রায়ের জয়ন্ত-মানিক জুটি । আমরা পড়তে পড়তে শিহরিত হয়েছি।

এই পর্যন্ত অল্পবিস্তর সবারই জানা । কিন্তু যদি বলি যে – এই এল ডোরাডো কিম্বা অ্যাটলান্টিস শুধু গল্পকথাই নয়, অসংখ্য গবেষণার পর প্রমানিত হয়েছে যে সত্যিই হয়তো আমাজন অরন্যের তলদেশে কিম্বা অ্যাটলান্টিকের গর্ভে তারা ঘুমিয়ে আছে আজও । এমনকি তারা সম্ভাব্য কোথায় কোথায় কতটা পলিমাটির গভীরে হারিয়ে গেছে সেটাও আমরা অনুমান করতে পারি উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে। এখন অবশ্য ন্যাশনাল জিওগ্রাফি আর ডিসকভারির দৌলতে গোটা পৃথিবীটাই আমাদের শোবার ঘর আবধি পৌঁছে গেছে ; তাই এসব তথ্য অনেকেরই জানা।

বেশ মেনে নিলাম।

কিন্ত যদি বলি , এদেশেও রয়েছে এল ডোরাডোর স্বর্ণভাণ্ডার । যদি বলি এদেশের অ্যাটলান্টিস রয়েছে আরব সাগররেই । তাহলে?

বিশ্বাস হল না বুঝি ?

বেশ, তবে প্রথমেই বলি কুমারী কান্দম বা লেমুরিয়ার কথা। প্রাচীন সংস্কৃত ও তামিল সাহিত্যে বর্ণিত মহাদেশ , যার অবস্থান ছিল আজকের কন্যাকুমারির ঠিক দক্ষিণে। তামিল জাতীয়তাবাদী পণ্ডিতদের মতে , এই মহাদেশেই প্রথম সমগ্র ভারতবর্ষ তথা দক্ষিন এশিয়ার সভ্যতার সূচনা । পরবর্তীকালে প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর সুনামির ফলে প্রায় ১৬০০০ বছর আগে যখন ধীরে ধীরে সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধি পেল, তখন আস্তে আস্তে গোটা একটা সভ্যতাই বিলীন হয়ে গেল ভারত মহাসাগরের গভীরে । তারপর সেখানের অধিবাসীরা নতুন দেশের খোঁজে চলল উত্তরে। শেষ পর্যন্ত আজকের দক্ষিণ ভারতের বিশাল অংশ জুড়ে তারা স্থাপন করল রাজ্য । সেই থেকেই নাকি শুরু হয় নতুন ভারতবর্ষের ইতিহাস। মনিমেখালাই,ভাগবত পুরান সহ মৎস্য পুরান – অসংখ্য বইতে এর উল্লেখ আছে ।

 

 

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে সত্যিই কি একটা গোটা মহাদেশ কিম্বা শহর ঘুমিয়ে থাকতে পারে জলের তলায় ? আর যা বললাম তার সবটাই কি সত্যি?

দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরটা আগে দিয়ে দিই। আধুনিক প্লেট টেকটনিক থিওরি অনুযায়ী লেমুরিয়ার এ তত্ব অচল। আজ থেকে লক্ষাধিক বছর আগে পৃথিবীর পুরো স্থলভাগটা ছিল একটাই অবিভক্ত অংশ। পরবর্তীকালে সেই অবিভক্ত অংশই আলাদা হয়ে সৃষ্টি করেছে আজকের এই বিভিন্ন মহাদেশগুলোকে।

কিন্তু আজ থেকে ১২০০০-১৪০০০ বছর আগে, শেষ বরফ যুগের অবসান যখন হয়নি তখন কিন্তু দক্ষিণ ভারতের মানচিত্রটা ছিল আজকের থেকে অনেকটাই আলাদা। তখনকার জলস্তর ছিল আজকের থেকে অন্তত ৬০ মিটার নীচে। পরবর্তীকালে বরফ যুগের অবসানের সাথে সাথে মেরু আঞ্চলের বরফ আর হিমবাহ গলে গিয়ে সৃষ্টি করে একাধিক সুনামি ও ভুমিকম্পের মত প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের। বেশ কয়েক দশক ধরে চলে এই পরিবর্তন। শেষ অবধি দক্ষিণ ভারতের তটভূমির একটা বিশাল অঞ্চল হারিয়ে যায় সমুদ্রের গর্ভে। সম্ভবত এখান থেকেই উৎপত্তি এই কুমারী কান্দমের গল্পকথার। কারন সহস্র বছর ধরে বংশানুক্রমে-গল্পকথায় এভাবেই মানুষের মনে গেঁথে থাকে বিপর্যয়ের স্মৃতি। এটাই আমার নিজস্ব মত।

এবার আমরা বরং খুঁজে দেখি প্রথম প্রশ্নটার উত্তর, তার সাথে সাথেই দেখি গল্পকথার ভেতর কোনভাবেও সত্যিকারের ইতিহাস রয়ে যায় কিনা …

প্রথমেই বলি…

পুগার ; তামিলনাড়ু রাজ্যের সমুদ্রতীরবর্তী এক অখ্যাত শহর । ১৯৬০ সাল নাগাদ ‘এ এস আই’ এর প্রখ্যাত মেরিন আর্কিওলজিস্ট ডঃ এস আর রাও এর নেতৃত্বে একদল বিজ্ঞানী অনুসন্ধান চালায় শহরের সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলে । কয়েকদিন ধরে তল্লাসি চালিয়ে শেষ পর্যন্ত সমুদ্রের ৩০-৪০ মিটার গভীরে পাওয়া গেল মনিমেখালাই পুরানে কথিত পুম্পুহার বা কাভেরিপুম্পাত্তিনাম বন্দর-শহরকে ; যা পুরান আনুযায়ী এক কালে ছিল কুমারী কান্দমেরই আংশ । সমুদ্রের তলদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পাওয়া গেল ৭০০০ বছরের পুরনো ধাতব মুদ্রা, ভঙ্গুর ইটের স্থাপত্য , পাথরের দেওয়াল ,পাতকুয়ো আরও কত কি!

 

 

২০০১ সালে গ্রাহাম হ্যানকক নামে এক প্রখ্যাত ব্রিটিশ লেখক এবং সাংবাদিক এই অঞ্চলে এসে এদেশের মেরিন আর্কিওলজিস্টেদের সহযোগিতায় দীর্ঘ গবেষণা চালান। শেষ পর্যন্ত উঠে আসে আরো কিছু অসাধারন তথ্য।

হ্যানককের মতে আজ থেকে প্রায় ১১৫০০ বছর আগে, শেষ ‘আইস এজ’এর পর পরেই – ৪০০ ফুট উঁচু এক বিশাল সুনামির ঢেউ আছড়ে পড়ে এই শহরের উপর। সেই থেকেই এই শহর মিলিয়ে যায় সমুদ্রের গভীরে। একদিন যে সব ঘরে খেলা করত ছোট শিশুরা , আজ সেখানেই অন্ধকারে বাসা বেঁধেছে সামুদ্রিক শ্যাওলা আর অক্টোপাসের দল। যেখানে সূর্যের আলো রাত্রির আঁধার কেটে নতুন ভোরের সূচনা করত আজ সেখানেই চির অন্ধকারের রাজত্ব।

ইতিহাসের অনুযায়ী সিন্ধু সভ্যতার সূচনা হয় আজ থেকে প্রায় ৫৩০০ বছরের আগে এবং মেহেরগড়ের সূচনা প্রায় ৯০০০ বছর আগে । অথচ এই শহর তো তার থেকেও প্রাচীন । তবে ইতিহাসের পাতায় কেন স্থান হলনা এর ?

(আই আই টি খড়গপুর সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী সিন্ধু সভ্যতার সময়কাল আরও ২০০০ বছর পিছিয়ে গেছে। এই বিষয়ে জানতে ক্লিক করুন এই লিঙ্কে । )


তবে জেনে রাখুন যে , আমাদের দেশে শুধু মাত্র অর্থাভাবে সমুদ্রের তলায় এর বেশি অনুসন্ধান চালানো যায়নি! আর ২০০৪ এর সুনামি তো পরিস্থিতিটাকে আরও প্রতিকূল করে তুলেছে । তারপর থেকে আর বিশেষ কাজ ও এগোয়নি। এভাবেই হয়তো আবহেলায় অযত্নে আমাদের চোখের আড়ালে, অন্ধকার জলের গভীরে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের দেশের ইতিহাস; গৌরবময় সভ্যতার নিদর্শন ।

এই সুনামি প্রসঙ্গে একটা কথা মনে এল। গল্পটা এই বেলা বলে রাখি।

দক্ষিণ ভারতের বিখ্যাত ট্যুরিস্ট স্পট মহাবলীপুরম ; পৃথিবী বিখ্যাত তার শোর টেম্পলের জন্য।

২৬ শে ডিসেম্বর ২০০৪। সময়টা সকাল ৯ টা । মহাবলীপুরম শহরের মানুষ অবাক বিস্ময়ে দেখলেন যে হটাৎ করেই সমুদ্রের জল যেন আস্তে আস্তে সরে যাচ্ছে তটরেখা থেকে একটু একটু করে দূরে। ধীরে ধীরে সমুদ্রের জল পিছিয়ে গেল প্রায় ৫০০ মিটার অবধি। উত্তাল সমুদ্র হয়ে উঠল, নিস্তরঙ্গ। কিন্তু অবাক হবার এখনো অনেকটাই বাকি ছিল। যে সব জায়গায় জেলেরা মাছ ধরার নৌকো নিয়ে ঘুরে বেড়ায় সেখান থেকে জল সরে যাবার পর দেখা গেল পুরো জায়গাটা জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে প্রাচীনযুগের কোন রহস্যময় স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষ।

 

 

উল্লেখ্য যে গত কয়েকশো বছর ধরেই স্থানীয় জেলেদের গল্প কথায় জানা যেত – আবহাওয়া পরিষ্কার থাকলে, সমুদ্র শান্ত থাকলে তারা যখন মাছ ধরতে সমুদ্রে নামে , তখন সূর্যের আলোয় পরিষ্কার দ্যাখা যায় আধ আন্ধকারে , জলের তলায় হারিয়ে যাওয়া এক প্রাচীন শহরকে। তবে এই কি সেই?

যাকগে, গল্পের পরের আংশটুকু হল ধংস আর মৃত্যুর। কিভাবে ৩৫ ফুট উঁচু সুনামির ঢেউ এসে ভাসিয়ে নিয়ে গেল অভাগা মানুষগুলোকে সে গল্পটুকু নাহয় এখানে নাই বা করলাম।

২০০৪ সালের ভয়ঙ্কর সুনামির পর লক্ষ লক্ষ ঘরছাড়া মানুষ আর স্বজন হারানোর দুঃখ সামলে দক্ষিণ ভারতের মানুষ যখন কিছুটা স্বাভাবিক হল তখন মহাবলীপুরম শহরের বাকি মানুষেরা আবাক বিস্ময়ে দেখল যে সুনামির আঘাতে উপকূলের মানচিত্রটা গেছে আমূল পালটে। সমুদ্রের তলা থেকে জেগে উঠেছে বহু প্রাচীন ভাঙ্গাচোরা পাথরের দেওয়াল। এমনকি দৈত্যাকার ঢেউয়ের আঘাতে সমুদ্রের নীচে থেকে শ্যাওলায় ঢাকা পাথরের তৈরি এক বিরাট সিংহ মূর্তি এসে পড়ে রয়েছে সমুদ্রতটে। কে জানে কোন সুদূর অতীতে সমুদ্র তার আফুরান খিদের তাগিদে গ্রাস করেছিল ; আর নোনতা জলের শীতল আবর্তে হারিয়ে যাওয়ার পর আবার কত হাজার বছরের ঘুম ভেঙ্গে ,এই সভ্যতার শাপমুক্তি হল সূর্যের উষ্ণালোকের স্পর্শে।

গল্পকথায় বলে যে, প্রাচীনযুগে মহাবলীপুরম শহরে জুড়ে ছিল অনবদ্য সাতটা মন্দির যাদের স্থাপত্যকলা অভিভূত করত স্বয়ং দেবতাদেরও । দেবরাজ ইন্দ্র তাদের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হন এবং ঈর্ষায় অন্ধ হয়ে তার আদেশে সমুদ্রের দেবতা তাদের মধ্যে ৬ টা মন্দিরকেই গ্রাস করে নেয় নিজের গভীরে। সৌন্দর্য আর অপরুপ ভাস্কর্যের মূর্ত প্রতীক হয়ে সমুদ্রতীরে দাড়িয়ে থাকে একটা মাত্র মন্দির – শোর টেম্পল । প্রাচীন কালে বহু ইউরোপিয়ান পর্যটকও তাদের লেখায় উল্লেখ করেছেন এই শহরের সাতটা অপুরুপ প্যাগোডা বা রথার কথা।


যাইহোক, ২০০৫ সালে আর্কিওলজি দপ্তর ওই অঞ্চলে আনুসন্ধান করে সমুদ্রের তলায় । বিশাল অঞ্চল জুড়ে নানান স্তরে পাওয়া যায় শ্যাওলা আর জলজ আগাছায় ঢাকা অসংখ্য মন্দিরের টুকরো আর কারুকার্য করা পাথরখন্ড । আর্কিওলজিস্টদের রিপোর্ট অনুযায়ী আজ থেকে প্রায় ২৫০০ বছর আগেও এই মন্দির শহর ছিল গুরুত্বপূর্ণ বন্দর। সম্ভবত ১০০০-১৫০০ বছর আগে খুব অল্প সময়ের মধ্যে বেশ কয়েকটা শক্তিশালী সুনামির আঘাতে শহরের একটা বিরাট আংশ ডুবে যায়।

এই নিয়ে আরও গবেষণা চলছে। অদূর ভবিষ্যতে হয়তো অতল জলের বুকে লুকিয়ে থাকা আরও অনেক রহস্যের উন্মোচন হবে।

এখানেই গল্পের শেষ নয় ।
আজ শেষ করব ইদানিং কালে এদেশের সবথেকে জনপ্রিয় আর বহুচর্চিত মেরিন আর্কিওলজির গল্পটা বলে।

 

 

‘দ্বারকা’ – মহাভারতে বর্ণিত এদেশের গুরুত্বপূর্ণ সাতটা শহরের মধ্যে অন্যতম। সমুদ্র উপকুলবর্তী পশ্চিম ভারতের প্রাচীন শহর ; বাসুদেব কৃষ্ণের শহর। হিন্দু ধর্মের পবিত্র চারটে ধামের মধ্যে অন্যতম। কথিত ছিল সোনার শহর দ্বারকা, পশ্চিম ভারতের শ্রেষ্ঠ শহর তথা বন্দর। ‘পেরিপ্লাস অফ দি ইরিথ্রিয়ান সী’ তে এর উল্লেখ আছে । প্রাচীন রোম, বিস্তীর্ণ ইউরোপ এবং ব্যাবিলনের বন্দর অবধি পারি জমিয়েছিল দ্বারকার দক্ষ নাবিকেরা।

মহাভারতে এবং ভাগবত পুরান অনুযায়ী কৃষ্ণের মৃত্যুর পর একদিন শান্ত সমুদ্র তার সৌম্য মূর্তি ভুলে হঠাৎই উত্তাল হয়ে ওঠে ।

(নির্দিষ্ট করে সময় নির্ধারণ করা মুশকিল তবে নক্ষত্রবিজ্ঞানের বিভিন্ন ঘটনা মিলিয়ে যারা এই বিষয়টা নিয়ে গবেষণা করেছেন তাদের মধ্যে মূলত তিনটে বহুল প্রচলিত মত রয়েছে – ১। মহাভারতের সময়কাল – ৩১৩৭ খ্রিস্ট পূর্ব , ২। মহাভারতের সময়কাল – ৫৫৬১ খ্রিস্ট পূর্ব , ৩। মহাভারতের যুদ্ধ হয়েছিল ১০০০-৮০০ খ্রিস্ট পূর্বের মধ্যে কোন একটা সময় । স্বভাবতই কৃষ্ণ যদি নিছক গল্পকথা না হয়ে বাস্তবের চরিত্র হয়ে থাকেন তবে তার মৃত্যু হয়েছে মহাভারতের যুদ্ধেরও অন্তত ৩৬ বছর বাদে ! কৃষ্ণের মৃত্যুতে , কলি যুগের আরম্ভ হয় – এই বহুল প্রচারিত মতটা মেনে নিলে ধরে নিতে হয় যে দ্বারকার ধ্বংস হয়েছিল অন্তত ৫০০০ বছর আগে । )

সমদ্রের জল সমস্ত বাধা ভেঙ্গে এগিয়ে আসে শহরের মধ্যে। সামান্য কিছু মুহূর্তের মধ্যেই সোনার শহর হারিয়ে যায় নীল সমুদ্রের গহীন তলদেশে। এমনকি শহরের সবচেয়ে উঁচু চূড়াটারও চিহ্ন মাত্র থাকেনা । তার উপর দিয়ে অনন্তকাল ধরে বয়ে চলে অবিরাম ঢেউ। আজ থেকে কয়েক দশক আগেও অবশ্য এ সবই বেদব্যাসের নিছক কল্পনা বলেই মনে করত বিজ্ঞানমহল।

 

 

১৯৬৩ সালে পুনের ডেকান কলেজ এবং গুজরাত সরকারের আর্কিওলজি দপ্তরের সহযোগিতায় আজকের দ্বারকা শহরের সমুদ্রতীর ঘেঁষে অনুসন্ধান চালানো হয় । উপকূল থেকে দেড় কিলোমিটার গভীরে পাওয়া যায় পাথরের তৈরি স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষ।আঞ্চলটা বেট দ্বারকা নামে পরিচিত।

সম্প্রতি এ এস আই’ এর প্রখ্যাত মেরিন আর্কিওলজিস্ট ডঃ এস আর রাও এবং ডঃ কে এইচ ভোরার নেতৃত্বে আবারো একদল বিজ্ঞানী অনুসন্ধান চালায় শহরের সমুদ্র উপকূলবর্তী এক বিশাল অঞ্চল জুড়ে। সমুদ্রতীর থেকে ৯ কিলমিটার দূরে জলস্তর থেকে ৪০ মিটার গভীরে বিস্তীর্ণও অঞ্চল জুড়ে মেলে প্রাচীন দ্বারকার ধ্বংসাবশেষ। এরপর প্রায় তিন দশক জুড়ে ‘এন আই ও’ র সহযোগিতায় স্কুবা ড্রাইভিং আর উন্নত জি পি এস – সোনার প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে খাম্বাত উপসাগরে পাওয়া গিয়েছে অসংখ্য প্রাচীন জাহাজের শেকল, ধাতব মুদ্রা, পাথরের ভাঙ্গাচোরা রাস্তা, আর তার সাথে সাথে পাথরের উঁচু প্রাচীর ঘেরা একটা আস্ত শহরকে । সমুদ্রের গভীরে পাওয়া কিছু কাঠের টুকরো আর পোড়া মাটির পাত্রের রেডিও কার্বন-১৪ পরীক্ষায় দেখা গেছে যে এই শহরের সময়কাল হতে পারে আজ থেকে প্রায় ৯৫০০ থেকে ২৩০০০ বছরের পুরনো।

যা হয়ত বদলে দিতে পারে এতদিনের প্রচলিত অনেক ধ্যান ধারনাকেই। তখন হয়তো আবার নতুন করে লিখতে হবে পৃথিবীর নগরকেন্দ্রিক সভ্যতার ইতিহাস । আবশ্য এই নিয়ে জোর গলায় কিছু দাবী করার আগে প্রয়োজন আরও অনেক গবেষণা আর অনুসন্ধানের।


মুশকিলটা হচ্ছে, গত হাজার হাজার বছর জুড়ে সেই হারানো শহরের উপর একটু একটু করে জমেছে প্রবাল আর মাটির স্তর , তাই তাকে বের করতে গেলে সমুদ্রের তলায় বেশ কিছু জায়গায় মাটি খোঁড়া প্রয়োজন। তার জন্য দরকার অনেক টাকা , উন্নত যন্ত্রপাতি আর সবথেকে বেশী দরকার সরকারি উদ্যোগ।

(খুব সম্প্রতি গুজরাতের সমুদ্রতট থেকে ৩০ কিলমিটার গভীরে এক গ্রামীণ সভ্যতার অবশেষ পাওয়া গেছে । এর সময়কাল সম্ভবত দ্বারকা শহরের চেয়েও প্রাচীন ।)

তবু দ্বারকা কে নিয়ে আশার আলো আছে । গুজরাত সরকার ঘোষণা করেছে দ্বারকা কে কেন্দ্র করে পৃথিবীর প্রথম আন্ডারওয়াটার মিউজিয়াম গড়ে তোলা হবে সমুদ্রের নীচে। মানুষের মধ্যে আগ্রহ বাড়ছে। হয়তো আজ থেকে বহু বছর পর সুযোগ আসবে আমাদের সামনে নাতি-নাতনীদের হাত ধরে সমুদ্রের তলায় হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস কে ছুঁয়ে দেখার!

যাইহোক , মোট কথাটা হল শুধু দ্বারকা , মহাবালীপুরম আর পুপুম্পুহারই নয়, আমাদের দেশের তথা এই পৃথিবীর অজস্র শহর/বন্দর/পিরামিড , আজ সমুদ্র কিম্বা নদীগর্ভের আন্ধকারে হারিয়ে গিয়েছে । কিছু খুঁজে পেয়েছি ,কিন্তু বেশিরভাগটা অজানাই রয়ে গেছে।

 

 

এই গল্পের আজ এখানেই দাঁড়ি টানলাম। শুধু যাদের এই লেখাটা পড়ে ভীষণ আগ্রহ হচ্ছে তাদের জন্য কিছু সূত্র রেখে শেষ করি। এদেশের সু-প্রাচীন বন্দর শহর মুজিরিসকে পাওয়া গেছে পাট্টানাম শহরের তীরবর্তী সমুদ্রে , খুব সম্প্রতি কিউবার কাছে গভীর সমুদ্রের তলায় সন্ধান পাওয়া গেছে এক অত্যন্ত রহস্যময় পিরামিডের, জাপানের উনাগানি আঞ্চলে সমুদ্রের তলায় পাওয়া গেছে এক বিস্তীর্ণ শহরকে ; আনেকেই মনে করছেন যা হল আদতে গল্পকথার ‘মু’ । এছাড়াও ইজিপ্টের আলেক্সান্দ্রিয়া শহরের কাছে – জলের তলায় পাওয়া গেছে মিশরের রানি ক্লিওপেত্রার প্রাসাদ ও প্রাচীন শহরকে… ব্যাস, আজকের মত এখানেই শেষ। বাকিটা ইন্টারনেট খুঁজে , বের করার ভার রইল আপনাদের উপর।

 

 

শেষবেলায় বলি , জাপান – কিউবা অবধি না গেলেও চলবে। আমাদের বাড়ির খুব কাছেই, এই বাংলারই আদিসপ্তগ্রাম আর তাম্রলিপ্ত ছিল সমৃদ্ধ বন্দর। গ্রিস, রোম অবধি বানিজ্য চলত সেখান থেকে।পর্যটকদের লেখায় উল্লেখ পাওয়া যায় আজ থেকে ৭০০/৮০০ বছর আগেও সপ্তগ্রাম বন্দর ছিল পৃথিবীর অন্যতম শস্তা বাজার!

সম্রাট আলেক্সেন্দ্ররের লেখায় উল্লেখ পাওয়া যায় তৎকালীন বাংলার গঙ্গাঋদ্ধি সাম্রাজ্যের প্রাচুর্যের ও তার সম্রাট অগ্রমেষের শক্তির কথা । সেই গঙ্গাঋদ্ধির বন্দর আজ কোথায় হারিয়ে গেছে ? আজকের তমলুকে তো তার কোন খোঁজ মেলেনা ! আজকের আদিসপ্তগ্রামেই কি লুকিয়ে আছে ষে যুগের সপ্তগ্রামের হারানো গৌরব !

নবদ্বীপ গিয়েছেন নিশ্চয়ই ! শ্রী চৈতন্যের জন্মস্থান নিয়ে প্রভূত বিতর্ক রয়েছে এবং এখন যেগুলো চৈতন্যের জন্মস্থান বলে পর্যটকদের দেখানো হয় তার একটাও ৩০০ বছরের পুরনো নয় ! শ্রী চৈতন্যের প্রকৃত জন্মস্থান আজ ভাগীরথীর গর্ভে !

ইতিহাস বলে আজ থেকে ১৫০০ বছর আগে এই বাংলারই সন্তান বিজয় সিংহ একদিন দিগ্বিজয়ী নৌবহর নিয়ে পারি জমিয়েছিল সিংহলে। জেনেটিক স্টাডি অনুযায়ী শ্রীলংকার মানুষ ও বাঙালিদের মধ্যে খুব আশ্চর্য মিল রয়েছে ( এই বিষয়ে আরও জানতে ক্লিক করুন এই লিঙ্কে )  ঐতিহাসিক হেম চন্দ্র রায়চৌধুরীর মতে তার জন্মস্থান সিংহপুরই হল রাঢ় বাংলার সিঙ্গুর ! সত্যিই কি হুগলীর সিঙ্গুরের নীচে লুকিয়ে আছে সেই হারানো রাজধানী ? কে খুঁজে বার করবে সত্যিটাকে ?

 

তেলকুপি বা প্রাচীন ভৈরবস্থান , পুরুলিয়া (ছবি – অমিতাভ গুপ্ত , উইকিমিডিয়া – https://commons.wikimedia.org/wiki/File:Boat_and_Submerged_Deul_at_Telkupi.jpg )

বর্ধমানের পাণ্ডু রাজার ধিপি থেকে শুরু করে দিহার,চন্দ্রকেতুগড়,দেবকোট, মোঘলমারি, বল্লাল ধিপি, কর্ণসুবর্ণ , তেল্কুপি …এমন কত আসাধারন প্রত্ন নিদর্শন অবহেলায়,আযত্নে…আমাদের সবার চোখের সামনে- রোদে,ঝড়ে,বৃষ্টিতে নষ্ট হচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার বছরের সভ্যতার ইতিহাস। শুধুমাত্র সরকারি উদ্যোগের আভাবে।

সে গল্প বরং বলব পরে – অন্য কোনদিন অন্য কোন সময় । আজ এখানেই থাক। এই লেখাটা পরে যদি আপনাদের একবারের জন্যও মনে হয় ইতিহাস মানে শুধু একঘেয়ে সাল তারিখই নয়- বরং তার ভেতরের অজানা রহস্যটাকে খুঁজে বের করার আনন্দও রয়েছে – তবে জানব আমার এই প্রচেষ্টা সার্থক।

ছবি সৌজন্য- গুগল ইমেজেস এবং উইকিমিডিয়া । লেখক বা প্রকাশক ছবির উপর কোনরকম স্বত্ব দাবী করেনা । Featured Image – Steemit .

*** লেখাটা ২০১৪ সালে কোন্নগরের ‘লুব্ধক’ পত্রিকার , শারদীয়া সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল । 

Read More Articles :

যদি কলকাতা শহর তৈরিই না হত ? 

সরস্বতীর উৎস সন্ধানে – In Search Of Lost River Saraswati

‘পানাম’ – বাংলার এক হারানো শহর (Panam – A Forgotten City Of Bengal)

বাংলার মন্দির স্থাপত্যের প্রকারভেদ ( Types Of Bengal Temple Architecture)

সমুদ্রগর্ভে হারানো সভ্যতা (A Tale of the Lost Underwater Cities )

বাংলার গ্রামীন স্থাপত্য (Vernacular Architecture of Bengal)

Arunava Sanyal Architect Sthapatya Article

 

Hits: 4261

Subscribe to our newsletter
Sign up here to get the latest news, updates and special offers delivered directly to your inbox.
You can unsubscribe at any time

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Leave A Reply

Your email address will not be published.

error: যোগাযোগ করুন - info.sthapatya@gmail.com